ডিও-ডোর-এন্ড
---------------------

রাজা মুখার্জি

বরোন্তির ঘটনার পরে (গল্প- শব্দ-জব্দ) পাকে-চক্রে টানা দুমাস কোনো অফ-ডে পেলাম না। আসলে রাজ্যে-র রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক স্তরে পর পর এত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটতে লাগল যে চিফ রিপোর্টার হিসেবে আমাকে অফিস করতেই হল। অবশ্য চিফ এডিটর বিশ্বজিতদাও এই সময়ে কোনো অফ ডে নেননি। তবে এবার একটা অফ-ডে পাওয়া যাবে মনে হয়। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও দিন তিনেকের জন্য উত্তরবঙ্গ সফরে যাবেন। অতএব কলকাতায় উত্তেজনা কম থাকবে। টিম পাঠিয়ে দেব। তাছাড়া জেলার সাংবাদিকরা তো আছেই। এই মওকায় একদিন রেস্ট নিতে হবে। দেখি বিশ্বজিতদাকে বলে। ফোন যখন ২৪ ঘন্টা খোলা থাকবে আপত্তি হওয়ার কথা নয়। দেখা যাক চ্যানেল ফাইভের চিফ রিপোর্টারের কপালে কী আছে।

দুপুরে ফার্স্ট এডিটোরিয়াল মিটিং শেষে বিশ্বজিতদা আটকে দিলেন আমায়।

- সাক্ষর একটু থাকবে প্লিজ, কথা আছে। আরে স্যান্ডি-টা আবার কোথায় গেল?

সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে নয় চিফ অ্যাঙ্কর হিসেবে স্যান্ডিকেও এই মিটিংগুলোয় থাকতে হয়। সমস্ত ডিপার্টমেন্টাল হেড-দেরই থাকার নিয়ম। ভিডিও এডিটিং-এর এইচ-ও-ডি দেবু দায়িত্ব নিল স্যান্ডিকে পাঠিয়ে দেওয়ার।

- আমাকে ডাকলে বিশ্বজিতদা?

মিনিট খানেকের মধ্যেই স্যান্ডির আগমন।

- হ্যাঁ, বোস। কথা আছে তোদের সঙ্গে।

আমি আর স্যান্ডি অবাক দৃষ্টি বিনিময় করি। এভাবে আমাদের দুজনকে নিয়ে বসা মানে নিশ্চয় কোনো ছক আছে। রিসেন্ট কোনো অপরাধের কথাও মনে পড়ছে না। বরোন্তির ঘটনার পর চ্যানেল স্যান্ডি-র গোয়েন্দা হিসেবে সাফল্যকে যথেষ্ট হাইলাইট করেছে। আগেই অ্যাঙ্কর হিসেবে সেলিব্রিটি ছিলই। এখন তো আরো। কয়েকদিন আগে আমার সামনেই অটোগ্রাফ চাইতেও দেখেছি। বিশ্বজিতদার একটা দীর্ঘ ফোনকল শেষ হল অবশেষে।

- শোন স্যান্ডি, বরোন্তির ঘটনার পর তোকে একটা প্রমোশন দেব প্রমিস করেছিলাম। কিন্তু অফিসের পলিসি অনুযায়ী মাস তিনেকের আগে সেটা সম্ভব নয়। তাছাড়া, বেচারা সাক্ষর দু-মাসের ওপর কোনো ডে অফ পায়নি।

কথা থামিয়ে আমাদের যেন মেপে নিলেন। আমরা এখনও সেই তিমিরে। স্যান্ডির চোখ মুখের এক্সপ্রেশন বলে দিচ্ছে এ রহস্যের তল ওরও ধরা ছোঁওয়ার বাইরে।

- আমি ভাবছি তোদের দুজনকে মানে তোকে আর সাক্ষরকে সি-এম এর সফরসঙ্গী করে নর্থ বেঙ্গল পাঠাব।

- প্লিজ না।

আর্তনাদের মতন এক সঙ্গে দুজনেই চেঁচিয়ে উঠি।

বিশ্বজিতদার ঠোঁঠে একটু যেন দুষ্টুমি মাখানো হাসি। এবার আমার দিকে ঘোরেন।

- আগে আমার পুরো কথাটা শোনো তোমরা। খাতায় কলমে তোমরা দুজন সফরসঙ্গী। কোনো ক্যামেরাম্যান যাবে না। দু-একটা যা নিউজ পাঠাবে জেলার ক্যামেরাম্যানই তোমাদের নির্দেশে কাজ করে দেবে। বাকি সব দায়িত্ব জেলার ছেলেদের। তোমরা দিন তিনেক চুটিয়ে ঘুরে এসো। ধরে নাও আর একটা প্রি-ম্যারেজ হানিমুন।

ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি বিশ্বজিতদার ঠোঁঠে। অগত্যা!

 

বিশ্বজিতদা-র মতন বস পেলে সব কিছুই করা যায়। এটাই ছিল স্যান্ডির আর আমার আলোচনার বিষয়। আমরা বসে আছি বক্সা ইকো রিসর্টের কাঠের বারান্দায়। নতুন তৈরি হচ্ছে এই রিসর্টটা। মুখ্যমন্ত্রী আশ্রয় নিয়েছেন বনদপ্তরের বাংলোয়। আজ বলার মতন ঘটনা একটাই। মুখ্যামন্ত্রীর হাঁটা। সন্তারাবাড়ি থেকে আরও কিলোমিটার দুয়েক গাড়ি যায়। তারপর প্রায় তিন কিলোমিটার হাঁটা। যার আশি শতাংশ চড়াই। এই রাস্তাটা যে স্পিডে হাঁটলেন উনি, সকলে তাজ্জব। ওনার দেহরক্ষীরাও তাল রাখতে পারছিল না।

বক্সায় এখন গোটা তিনেক রিসর্ট। সবকটাই ভর্তি। মূলত সরকারি লোকজন আর মিডিয়ার লোকের ভিড়। তাও অনেকে আলিপুরদুয়ার ফিরে গিয়েছে। কাল ভোরে আবার আসবে। আমাদের রিসর্টে মিডিয়া ছাড়াও দুটি টুরিস্ট পার্টি আছে। একটা পাঁচজনের ছেলেদের দল। আর দুটো ফ্যামিলির চারজন। আমাদের রিসর্টটা পাহাড়ের একধারে। দোতলা। আমরা দোতলার একটা ঘরে। তার পাশে আর একটা ডাবল বেড। সেখানে উঠেছে কলকাতা থেকে আসা আরএকটি চ্যানেলের রিপোর্টার, ক্যামেরাম্যান। আমাদের জেলার ছেলেরা আলিপুরদুয়ারেই ফিরেছে। দোতলায় আর একটা ফাইভ বেডেড ডর্ম আছে। পাঁচটি ছেলের দল আছে সেঘরেই। হাল্লা শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। সামনের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে ভেঙে পড়তে বসা বক্সা দুর্গ। হয়তো অন্ধকারের মতন তার বুকেও জমে আছে না বলা অনেক অভিমান।

ভোর রাতে একটা আর্ত চিত্‌কারে ঘুম ভেঙে গেল। তারপরই হইচই। গরম জামা গায়ে চাপিয়ে বাইরে এলাম। গোলমালটা হয়েছে ডর্মে। গিয়ে দেখি চারটি ছেলে ভয়ঙ্কর উত্তেজিত আর আতঙ্কিত। ঘরের ভিতরদিকের একটি দরজা হাট করে খোলা। যার বাইরে সরাসরি খাদ। ভারি অদ্ভুত্‌তো। জানা গেল সুবিমল নামে দলেরই একজন সম্ভবত বাথরুম ভেবে ভুল করে ওই দরজা খুলে একেবারে খাদে তলিয়ে গিয়েছে। এখানে বলে রাখা দরকার, বক্সায় তখনো ইলেকট্রিসিটি আসেনি। রাতে সোলার টর্চ আর ল্যান্টার্নই ভরসা। স্যান্ডি নিজের এলইডি টর্চের আলোয় সব খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। সকলকে নির্দেশ দিল বাইরের বারান্দায় গিয়ে বসতে। আলো না ফুটলে উদ্ধার কাজে নামা যাবে না।

বারান্দায় তখন বেজায় ভিড়। রিসর্টের সকলেই উপস্থিত।

- আপাতত পুলিশ না আসা পর্যন্ত এঘরে কেউ ঢুকবেন না। আর রিসর্টের ম্যানেজার কোথায়?

স্যান্ডির কর্তৃত্বপূর্ণ নির্দেশ সবাই মেনে নিল। ভিড় ঠেলে সামনে এলেন রিসর্টের মালিক কাম ম্যানেজার সুমনবাবু।

- খাদের দিকে দরজা কেন?

স্যান্ডির সপাটে প্রশ্ন। এ প্রশ্নটা বোধহয় এখানে উপস্থিত সকলেরই।

- ওটা ডর্মের সঙ্গে আরএকটা অ্যাটাচ বাথরুমের প্রভিশন রাখা হয়েছে। দেখছেন তো এখনও কাজ চলছে রিসর্টের।

  মালিক বেশ ঘাবড়েছেন গলা শুনলেই বোঝা যায়। সেটা স্বাভাবিকও।

- তা ওরকম বিপজ্জনকভাবে ছেড়ে রেখে দিয়েছেন! তারপর সে ঘরে টুরিস্ট রেখেছেন!

স্যান্ডির গলা শুনেই বোঝা যায়, বেজায় রেগেছে।

- বিশ্বাস করুন ম্যাডাম ওই দরজায় তালা দেওয়া ছিল।

  সুমনবাবুর কথায় সায় মিলল ওই ঘরে থাকা দলের আরও জনা দুয়েকের কথায়।

- হোয়াট? আই সি।

হঠাত্‌ গম্ভীর স্যান্ডি।

- কত বড়ো তালা ছিল?

- ওই স্যুটকেস বা লাগেজ ব্যাগে যেমন থাকে। চাবি এখনও আমার কাছে।

- আপনারা কেউ কোত্থাও যাবেন না। সাক্ষর আয়তো।

আমরা দুজন আবার ডর্মে ঢুকি। স্যান্ডি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দরজার সঙ্গে লাগানো কড়া দুটোর আশপাশে পরীক্ষা করে। সুবিমল যে বিছানায় শুয়েছিল বলে জানা গিয়েছে তার বালিশ উল্টে কি দেখল। বিছানার সাদা চাদরের উপর থেকে একটুকরো লাল সুতো তুলে নিল। খুব সম্ভবত বালিশের ওয়ারের সুতো। বাকি ঘরটা আরও একবার মন দিয়ে দেখল। ঘরের কোণে থাকা ট্র্যাশ ক্যানটাও সাবধানে ঘেঁটে দেখল। দুটো খালি মদের বোতল। গোটা তিনেক খালি সিগারেটের প্যাকেট। ব্যাস আর কিছু নেই। স্যান্ডির মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে খুব চিন্তান্বিত। বাইরে এলাম আমরা। পূব আকাশ তখন ধীরে ধীরে কমলা।

মুখ্যমন্ত্রী আসার সুবাদে জেলার পুলিশ আধিকারিকেরাও উপস্থিত বক্সায়। তাই তাদের খবর পেতে দেরি হয়নি। খোদ আলিপুরদুয়ারের এসপি সপার্ষদ হাজির।

- কই কোথায় দুর্ঘটনা ঘটেছে। দেখি।

তারপরই একেবারে আমাদের মুখোমুখি। আমার সঙ্গে কালকে আলিপুরদুয়ার পৌঁছেই আলাপ হয়েছে। আর উনি স্যান্ডিকে চেনেন। এখন কে চেনে না?

- আরে স্যন্দিকা ম্যাডাম যে। কী করে ঘটল দুর্ঘটনা?

- ঘটেনি, ঘটানো হয়েছে।

- মানে!

নিমেষে চারিদিক নিস্তব্ধ। সকলের চোখেমুখেই বিস্ময়ের ছাপ।

- বিপজ্জনক দরজার তালা ভেঙে পুরো সিচ্যুয়েশনটা ভালনারেবল করে রাখা হয়েছিল। এই মুহুর্তে শুধু এটুকু বলি এসপি সাহেব, দ্যাট ব্লাডি পার্সন ইজ আ কোল্ড ব্লাডেড মার্ডারার। অ্যান্ড টু মাচ ইন্টালিজেন্ট।

এসপি সাহেবের নির্দেশে হতভাগ্য সুবিমলের দেহ উদ্ধারে তত্‌পর হয়ে পড়ল পুলিশ। বড় সাহেব নিজেই জেরায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সঙ্গে অবশ্যই স্যান্ডি। এই অবসরে ঘরের বর্ণনাটা দিয়ে রাখি। পরে যেটা খুব ইম্পর্টেন্ট হয়ে উঠবে।

বক্সা দুর্গের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে এল শেপ বারান্দার লম্বা অংশটা বাম দিক থেকে ডান দিকে বিস্তৃত। বারান্দার পিছনে লাগোয়া পাশাপাশি দুটি রুম। যার বাঁ দিকেরটায় আমরা আছি। ডানদিকেরটায় আর একটি চ্যানেলের সাংবাদিকরা। সেই রুমের ডানদিকে এল শেপ বারান্দার ছোটো অংশটা। যার ডানদিকে পাঁচ শয্যার ডর্ম। রুমের ঠিক মাঝামঝি বারান্দার দিক থেকে ঘরে ঢোকার দরজা। দরজার সামনে দাঁড়ালে ডান দিকে পাশাপাশি দুটি খাট। মাঝে সামান্য গ্যাপ। দ্বিতীয় খাটের পরেই ডানদিকের দেওয়ালে উল্টোদিকের দেওয়াল সংলগ্ন সেই মৃত্যু দরজা। ঘরের বাঁদিকের সজ্জাও আইডেন্টিকাল। অর্থাত বাঁদিকে পাশাপাশি দুটি খাট তারপরই বাথরুমের দরজা। বারান্দার দরজা দিয়ে সোজা ঢুকলেই সামনে টেবিল। তার পিছনেই দরজা থেকে উল্টোদিকের দেওয়াল বরাবর লম্বালম্বি পাতা সিঙ্গল কট। যে খাটে শুয়েছিল সুবিমল। খাট থেকে নেমে বাথরুমের বদলে উল্টো দিকের দরজা খুলে খাদে গিয়ে পড়েছে। অনেক সময় নতুন জায়গায় গেলে ঘুমের ঘোরে অনেকেরই এরকম দিকভ্রান্ত দশা হয়। আমারই কতবার হয়েছে। দেওয়ালে গুঁতো খেয়েছি। তাহলে স্যান্ডি এটাকে প্ল্যানফুল মার্ডার বলছে কেন? একটা কারণ হতেই পারে, দরজার তালা ভাঙা হয়েছে তাই। কিন্তু সেক্ষেত্রে সুবিমল কেন, এই দুর্ঘটনাটা যে কারো সাথেই হতে পারত! তাহলে? এই জায়গায় এসে সব ঘেঁটে যাচ্ছে।

সুবিমলের দেহ উদ্ধার হয়েছে। যা বিভত্ষ দৃশ্য, বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই। মোট কথা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু হয়েছে। পড়েছেও প্রায় সাত থেকে আটশো ফিট নিচে। মুখ্যমন্ত্রীর টিমের ডাক্তার এসে মৃত্যুর কারণ এবং সময় নিশ্চিত করেছেন। দেহ আলিপুরদুয়ার পাঠানো হবে ময়না তদন্তের জন্য। মুখ্যমন্ত্রী নিজে দুর্ঘটনার কথা শুনে দেখা করতে এসেছেন। এটা হত্যা জানার পর উনি প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন হত্যাকারিকে কঠোর সাজা দেওয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে। উনিও স্যান্ডির কীর্তিকলাপের খোঁজ রাখেন জানা গেল। স্যান্ডিকে উত্‌সাহিত করলেন তদন্তে। প্রশাসনিক সহায়তার আশ্বাসও দিলেন। 

সবাই যে যার রিসর্টে আর বাঙলোয় ফিরে গিয়েছেন। সুবিমলের বন্ধুদের রিসর্ট ছেড়ে বেরোতে মানা করে গিয়েছেন এসপি সাহেব নিজে। আমরা দুজন বারান্দায়। সুমনবাবু নিজে ব্যাক্তিগত তত্বাবধানে চা করিয়ে নিয়ে এসেছেন। আমাদের পাশের রুমের সাংবাদিক বন্ধু বেরিয়েছে সাইড স্টোরির খোঁজে। বারবার অনুরোধ করেছে খুনি ধরা পড়লে যেন ওদেরও জানাই। কী আশ্চর্য, সেতো সবাই জানতে পারবে! এর মধ্যে আর এক্সক্লিউসিভ কী পাবে! তাছাড়া আমাদের চ্যানেলে আগে খবর যাবে সেটাই স্বাভাবিক। কারণ ঘটনার গতি প্রকৃতি থেকে আমি নিশ্চিত এবারও স্যান্ডিই বাজি মারবে। পুলিশের আগেই মারবে। সুমনবাবু অনেকক্ষণ থেকেই কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে।

- বসুন সুমনবাবু।

স্যান্ডির অনুরোধে একটা চেয়ার টেনে নিলেন উনি।

- ম্যাডাম পুলিশ আমাকে অ্যারেস্ট করবে নাতো?

- করা উচিত ছিল। যদি আমি না উপস্থিত থাকতাম এতক্ষনে আপনি লক-আপে থাকতেন। নাও টেল মি ফিউ থিঙ্গস। আপনি ওরকম আনফিনিশড একটা রুম ভাড়া দিয়েছিলেন কেন?

- এই দলটা কাল হঠাত্‌ চলে আসে। এদিকে মুখ্যমন্ত্রী আসছেন খবর পেয়ে আপনারা সব আগেই বাকি রুম বুক করে ফেলেছেন। বক্সায় থাকার একটাও জায়গা ছিল না। ওরা খুব অনুরোধ করতে লাগল তাই…

- আপনিও ফটাস করে দিয়ে দিলেন। হোয়াই ডোন্ট ইউ অ্যাডমিট দ্যাট সুযোগ বুঝে আপনিও গ্রিডি হয়ে পড়েছিলেন।

স্যান্ডির গলায় বিরক্তি স্পষ্ট। সুমনবাবু পারলে মাটিতে মিশে যান।

- ওদের বিপদের কথাটা জানিয়েছিলেন?

- হ্যাঁ, ম্যাডাম। আমি নিজে রুম খুলে, ওই দরজায় তালা লাগিয়ে সাবধান করে দিয়েছিলাম। তাছাড়া দরজায় তালা লাগানোয় আমিও নিশ্চিত ছিলাম।

- হুম। ইউ মে গো নাও। ব্রেকফাস্ট-টা একটু তাড়াতাড়ি দেখুন।

স্যান্ডি উঠে রুমে ঢোকে। নিশ্চিত বাথরুম যাবে। সকাল থেকে তো যায়নি। জেরা চলার সময় আমি অবশ্য সব ঝামেলা মিটিয়ে নিয়েছি। এই প্রথমবার হল, যখন তদন্তের কোনো অংশ আমি মিস করলাম। আসুক স্যান্ডি, জিগ্যেশ করতে হবে জেরায় কী পাওয়া গেল। প্রায় আধঘন্টা পরে ও এল।

- হ্যাঁরে জেরায় কী পাওয়া গেল?

ও যা বলল, তা সাম আপ করলে এরকম দাঁড়ায়। সুবিমলরা পাঁচ বন্ধু। সকলেই উত্তরবঙ্গের বাসিন্দা। একসঙ্গে কলেজে পড়েছে। চাকরি আর ব্যবসাসূত্রে এখন আলাদা। তবে বছরে বার দু-তিন, উইকেন্ডে এরকম বেরিয়ে পড়ে। সুবিমল, অনির্বাণ শিলিগুড়ির ছেলে। সুবিমল ব্যাঙ্কে চাকরি করত। অনির্বানের চা-এর হোলসেল। সমীরনের বাড়ি মালবাজারে। ট্রাভেলস-এর ব্যবসা। গাড়ি ভাড়া দেয়। ওর গাড়িতেই সবাই সান্তারাবাড়ি অবধি এসেছে। প্রথম দুজন ভোরের প্যাসেঞ্জারে নিউ মাল চলে এসেছিল। অভীক আর দুলাল জলপাইগুড়িতে থাকে। অভীক একটি মাল্টিন্যাশনাল ওষুধ কোম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ। হেডকোয়ার্টার জলপাইগুড়ি। দুলালের ওষুধের রিটেল আর হোলসেল বিজনেস। ওরা মালে পৌঁছয় অভীকের বাইকে। বাইক সমীরনের বাড়িতে রাখা। সকলেরই বয়স ২৮ থেকে ৩০ এর মধ্যে। এরমধ্যে সুবিমল আর অভীক বিবাহসূত্রে আত্মীয়। সুবিমল অভীকের ভগ্নিপতি। মাস আষ্টেক আগে বিয়ে হয়। তবে সেই এপিসোড-টা খুব করুণ। বিয়ের মাস দুয়েকের মাথায় সেবক থেকে পুজো দিয়ে বাইকে ফিরছিল সুবিমল, সস্ত্রীক। পাহাড়ি রাস্তায় চাকা স্কিড করে দুর্ঘটনা ঘটে। স্ত্রী ঘটনাস্থলেই মারা যায়। কারণ বাইক তিস্তার খাদে গড়িয়ে পড়েছিল। ভাগ্যক্রমে সুবিমল বেঁচে যায়। তবে দিন কুড়ি হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে। তারপর থেকেই সুবিমল সকলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা প্রায় ছেড়ে দেয়। অভীক আর অনির্বাণ অনেক বুঝিয়ে এই ট্রিপটায় আসতে রাজী করায়। ওদের বিশ্বাস, নাহলে সুবিমলকে স্বাভাবিক করা যাবে না। অভীক খুবই মুষড়ে পড়েছে সুবিমলের মৃত্যুতে। নিজেকেই দায়ী করছে। ও জোর না করলে সুবিমল বেঁচে থাকত। তবে কেউ-ই বলতে পারছে না ওদের মধ্যে কেউ কেন সুবিমলকে খুন করতে যাবে! এ প্রসঙ্গে আর একটা কথা জানা যায়। সুবিমলের বিয়ের আগে ওরা শেষবার দলবেঁধে বেড়াতে গিয়েছিল লাভা। প্রায় মাস দশেক আগে। সেখানে সুবিমল আর দুলালের মধ্যে প্রচন্ড ঝগড়া হয়। ঘটনা প্রায় হাতাহাতির জায়গায় যায়। কারণ ব্যাঙ্কলোন। দুলাল তার ব্যবসা বাড়াতে একটা ব্যাঙ্কলোনের জন্য সুবিমলের সাহায্য চায়। সুবিমল নাকি পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক প্রত্যাখ্যান করে। তারপর যা হয়। মদের নেশার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে উত্তেজনা। শেষে বাকি তিনজন অনেক কষ্টে ব্যাপারটা মিটমাট করে। কোথাও বেড়াতে গেলে ম্যানেজার অভীক-ই হয়। এবারেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। তাছাড়া মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ বলে দলের হাফ ডাক্তারও ও। সকলের শোওয়ার অ্যারেঞ্জমেন্টটা ওরই করা। অর্থাত্‌ কে কোন বেডে শোবে। আর অতটা পথ হেঁটে ওঠায় যাতে গায়ে গতরে ব্যাথা না হয়, আর সুনিশ্চিত ঘুম হয় তাই ওর পরামর্শে সবাই একটা করে অ্যালপ্রাজোলাম পয়েন্ট টুফাইভ খেয়েছিল। ওর কাছেই ছিল।

- এর বেশি আর কিছুই জানা যায়নি?

- জানা গ্যাছে। আর একটা ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট। তোকে বলতে ভুলে যাচ্ছিলাম আর একটু হলেই।

- কী?

- অনির্বাণের-ও নাকি অভীকের বোনের ব্যাপারে ইন্টারেস্ট ছিল। বিয়ে করবে বলে খেপেও উঠেছিল একসময়।

- বাবা, এতো বেশ ঘোরালো হয়ে উঠল।

- তার থেকেও মজা, এই তথ্যটা আমাকে পার্সোনালি জানানো হয়েছে। জানিয়েছে সমীরন। পরে অবশ্য আমি অভীকের থেকে ক্রশচেক করেছি। ঘটনাটা সত্যি।

- হুম তাহলে দেখা যাচ্ছে সুবিমলকে হত্যার মোটিভ দুজনের আছে। দুলাল আর অনির্বাণ। তাই তো?

- না রে। দুলালের মোটিভ খুব স্ট্রং নয়। মাল খেয়ে বাওয়াল। আর সেই রাগ ১০ মাস পুষে রেখে মার্ডার। না, ঠিক যাচ্ছে না।

- অনির্বাণের-টা কিন্তু বেশ স্ট্রং।

- আই অ্যাম নট শ্যিওর।

- কেন ঝান্ডির ঘটনা (গল্প- রিরংসা) ভুলে গেলি?

- বালের কথা বলিস নাতো। দুটো আলাদা কেস।

ব্যস। শুরু হল স্যান্ডির মুখ খারাপ করা। 

- তাছাড়া আই নো, হু ইজ দ্য ব্লাডি কালপ্রিট।

- ও কেস সলভ্ড!

- না। একটু গাঁট আছে। দাঁড়া একটা ফোন করে আসি। এখানে সিগন্যালের যা অবস্থা। বোধহয় ফোর্টের সামনের মাঠটায় সিগন্যাল পাওয়া যাবে।

- কাকে ফোন করবি!

- সেবক থানায়।

এক কথায় আমাকে থামিয়ে দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায় স্যান্ডি। আমি হতভম্ব হয়ে বসে থাকি।

 

 ব্রেকফাস্টের পর স্যান্ডি আমাকে নিয়ে বনবাংলোর দিকে রওনা দিল। উদ্দেশ্য এসপি-র সাথে পরামর্শ করা। এসপি-ও সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এলেন। সকলের থেকে খানিকটা আড়ালে একটা চিকরাশি গাছের নিচে দাঁড়ালাম তিনজনে। স্যান্ডি কোনো ভনিতা না করে সোজা পয়েন্টে চলে এল।

- দেখুন স্যার, আমি জানি খুনি কে। মোটিভ কী। অ্যান্ড হোয়াট ইজ দ্য মোডাস-অপারেন্ডি। বাট আই কান্ট প্রুভ ইট। শুধু তিনটে পয়েন্ট দিতে পারি।

- হুম। বেশ আপনি তাই দিন। তারপর আমাদের নিজস্ব দাওয়াই তো আছেই।

- খুনি অভীক।

আমি আর এসপি সাহেব দুজনেই বিস্মিত। কিন্তু আইপিএস তো, তাই আগে উনিই সামলালেন।

- বেশ বলে যান।

- মোটিভ হচ্ছে বোনের মৃত্যুর বদলা। ওর বদ্ধমূল ধারণা, সুবিমল প্রকারান্তরে ওর বোনের হত্যাকারী। ওদের জিনিষপত্র তো আপনাদের হেফাজতে। অভীকের ব্যাগ খুঁজলে একটা স্ক্রু-ড্রাইভার পাওয়া যাবে আই বিলিভ। এছাড়া ঘুমের ওষুধের পাতাটাও জরুরি। আর হ্যাঁ, আর একটি ওষুধ খুঁজবেন। কোনো ডাইউরেটিক ড্রাগ। খুব সম্ভবত ল্যাসিক্স বলে কোনো ট্যাবলেট পাবেন। পোস্ট মর্টম-এর ডক্টরকে একটু স্পেশালি বলবেন সুবিমলকে এই টাইপের ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে সেটা খুঁজে পাওয়া যায় কিনা এবং সেটা উনি ওনার রিপোর্টে যেন অবশ্যই মেনশন করেন। আর একটু সেবক থানায় খোঁজ নেবেন। ছমাস আগের একটা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা নিয়ে এবং তার পর পরই একটি ডায়রি করা হয়েছিল সুবিমলকে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করে। জানি না কনভিকশনের জন্য এনাফ কিনা।

- আপনি যা যা বললেন সব যদি মেলে তবে চিন্তা করবেন না, আমরা বুঝে নেব। কিন্তু মোডাস-অপারেন্ডিটা না জানলে…

- আজ বিকেলেই জানাব। তবে তার আগে জানতে হবে আমি যা যা বললাম অভীকের ব্যাগে সেই সব পাওয়া যায় কিনা। নাহলে আমার থিওরি দাঁড়াবে না।

- ওকে, আগে সার্চ করি। যদি সবকটা জিনিষ পাওয়া যায় তাহলেই অভীক-কে অ্যারেস্ট করব।

- প্লিজ, আমাকে জানাবেন একটু।

- অবশ্য-ই ম্যাডাম।

আমরা রিসর্টের দিকে ফিরতে থাকি।

- কিন্তু স্যান্ডি কী করে...

- প্লিজ সোনা, একটু সবুর কর। কনফার্মেশনটা পাই। মার্ডারার ইজ ভেরি শ্রুড। ও যদি একটা জিনিষও সরিয়ে ফেলে থাকে, এস্টাব্লিশ করা কঠিন হবে। তাই আপাতত প্রে কর, যেন আমি ঠিক হই। না হলে বেইজ্জত হয়ে যাব। তার ওপর খোদ সিএম রয়েছেন। আই উইল বি ফিনিশ্ড।

- টেক ইট ইজি ডার্লিং। আমি জানি তুই-ই জিতবি।

 

সবে লাঞ্চ সেরেছি, এমন সময় এক উর্দিধারী হাজির। একটা হাতচিঠি নিয়ে। এসপি-র চিঠি। নিশ্চয় ফোনে পাচ্ছেন না। স্যান্ডিকেই লেখা।

স্যন্দিকা ম্যাডাম,

আপনাকে অভিনন্দন আর একটি রহস্যের জট খোলার জন্য। সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ। আপনি যা যা বলেছিলেন সব পাওয়া গিয়েছে। এমনকি আপনার বলা ব্র্যান্ড নেমে-র ওষুধও পাওয়া গিয়েছে! সঙ্গে একটি মোক্ষম প্রমাণ। ভাঙা তালাটি। অনারেবল সিএম আপনাকে বিকেল পাঁচটায় দেখা করতে বলেছেন। উনিও আগ্রহী। আমরাও।

নমস্কার নেবেন

 

  ……..

 

- অনেক সময় ইন্টালিজেন্ট পার্সনস অলসো কমিটস সিলি মিসটেকস। অভীকের ব্যাপারটা বোধহয় তাই। সম্ভবত তালাটা ভাঙার পর ফেলার সময় পায়নি। দ্যো, ওয়ান মোর প্রবাবিলিটি ইজ দেয়ার। আই থিঙ্ক সেটাই ঠিক।

- কী সেটা?

- বললেই তো বলবি আমি কলার তুলছি।

- বলই না।

- অভীক দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি, স্যন্দিকা মুখার্জির মুখোমুখি হতে হবে। তাই ও নিশ্চিত ছিল, এটা দুর্ঘটনা প্রমাণিত হবে, আর ও হাসতে হাসতে ওর ক্রাইমের প্রমাণ লোপাট করবে ধীরে সুস্থ্যে।

স্যান্ডির মুখে আত্মপ্রসাদের হাসি। নাও শি ডিজার্ভ আ লঙ কোয়ায়েট কিস।

 

ঠিক বিকেল পাঁচটায় পৌঁছলাম বনবাংলোয়। বাইরের হল ঘরটায় তিল ধারণের জায়গা নেই। ভিড় মূলত মিডিয়ার। বেশ একটা প্রেস কনফারেন্সের মতন সাজানো হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই আসরের মধ্যমণি সিএম। এক সময় পলিটিকাল বিট করতাম। তাই সিএম-এর সঙ্গে আমার ভালই আলাপ। তখন অবশ্য উনি সিএম ছিলেন না। মানুষ ভাল। স্যান্ডিকে দেখতে পেয়েই হাসলেন।

- স্যন্দিকা এখানে এসো। আমার পাশে।

- কিন্তু আমি তো সবার সামনে কিছু বলব না। আমার মেথড অফ ডিডাকশন আমার চ্যানেলের এক্সক্লিউসিভ স্টোরি।

স্যান্ডির সাফ কথা। পেশাদার মেয়ে। সঙ্গে সঙ্গে সিএম-এর ইশারা। সবাইকে বাইরে ওয়েট করতে বলা হল। দৃশ্যতই আমার অন্যান্য হাউজের সহকর্মীরা ক্ষুব্ধ। কিন্তু এক্ষেত্রে কিচ্ছু করার নেই। ঘরে সিএম, আমরা দুজন ছাড়া, আলিপুরদুয়ারের এসপি, ডিএম আর আছেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী।

- কী করে কী বুঝলে আমাদের বলতে নিশ্চয় আপত্তি নেই? তাছাড়া আমরা কথা দিচ্ছি মিডিয়ার সামনে এ ব্যাপারে কিচ্ছু বলব না।

সকলেই ঘাড় নেড়ে সায় দেন। স্যান্ডি সিএম-এর কথার ভঙ্গিমায় হেসে ফেলে।

- আপনাকে নিশ্চয় বলব। এলাম তো সেই জন্যই।

একটু থেমে গুছিয়ে নেয়। তারপর শুরু করে।

- প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর হিসেবে এটা ফোর্থ কেস। বোধহয় দ্য সর্টেস্ট কেস টু। এত তাড়াতাড়ি কোনো রহস্য আগে সলভ করিনি। বাট স্টিল আই মাস্ট অ্যাডমিট যে কালপ্রিটের বুদ্ধির আমি ফ্যান হয়ে গেছি। কী অসাধারন মোডাস-অপারেন্ডি! দরজায় তালা ছিল জানার পরই আমার কাছে ক্লিয়ার হয়ে যায় এটা অ্যারেঞ্জড অ্যাক্সিডেন্ট। তারপর সুবিমলের খাটের উপর এইটা পেলাম।

স্যান্ডি হিপপকেট থেকে ছোট প্লাস্টিকের পাউচ বের করে। তার মধ্যে সকালে পাওয়া সেই লাল সুতো। সবাইকে দেখিয়ে এসপি সাহেবের হাতে তুলে দেয় পাউচটা।

- সাক্ষর সুতোটা বিছানার কোন দিকে ছিল তোর মনে আছে?

- পায়ের দিকে।

- কী করে বুঝলি ওটা পায়ের দিক?

- বালিশটা তো দরজার দিকে ছিল। আর সুতোটা ছিল দেওয়ালের দিকে।

- রাইট। এটাই মার্ডারারের মোক্ষম চাল। শুধু ওয়ারের সুতোটা না বেরোলে আমাকে আরও বেশি ভাবতে হত।

একটু চুপ করে। ঘরে পিন ড্রপ সায়লেন্স। একটু জল খেয়ে নেয় স্যান্ডি।

- পাহাড়ে বাড়ি বা হোটেলে শূন্যে বাথরুমটা বেশ কমন ব্যাপার। দেওয়াল থেকে কাঠের বা লোহার ব্রেসিং লাগিয়ে শূন্যে খানিকটা জায়গা চুরি করে নেওয়া যায়। যার উপর বাথরুমের মতন ছোটো রুম, অনায়াশে বানানো যায়। রিসর্ট মলিকেরও তাই পরিকল্পনা ছিল। প্র্যাক্টিক্যালি রিসর্টের দোতলার সব বাথরুমই এই ভাবে বানানো। দলের ট্যুর ম্যানেজার হওয়ায় অভীককেই প্রথম রুম দেখাতে নিয়ে যান সুমনবাবু। সাবধান করেন খাদের দরজাটা দেখিয়ে। তালাও দিয়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে শ্রুড অভীকের মাথায় প্ল্যান এসে যায়। তার মধ্যে খাটের অ্যারেঞ্জমেন্ট এবং বাথরুমের অবস্থান সব ওর প্ল্যানটাকে সাপোর্ট করে। তখনই ঠিক করে ফেলে মাঝখানের একলা খাটে শোওয়াতে হবে সুবিমলকে। এটাতো প্রিলিমিনারি এক্সিকিউশন অফ হিস প্ল্যানিং। সেকেন্ড ফেজটাই আসল। যেখানে চান্স ফ্যাক্টর থাকবে। অর্থাত সুবিমলকে বাথরুম যেতে হবে এবং ভুল করে উল্টোদিকে যেতে হবে। এখন যদি সুবিমল বেশিবার বাথরুম না যায় তাহলে? আবার গেলো, কিন্তু সঠিক বাথরুমেই ঢুকল। অর্থাত ভুল করল না, তখন? এখানেই পরপর দুটো মাস্টারস্ট্রোক দিল অভীক। ঘরে কম লাইট হওয়ার সুযোগ নেয় ও। আই বিলিভ ও নিজেই ছিল বারটেন্ডার। তাই নিজে কম মদ খেয়েছে এবং সম্ভবত সুবিমলকে একটু বেশি বেশি দিয়েছে। নিজে কম খাওয়ার কারণ প্ল্যান এক্সিকিউট করতে ওকে জেগে থাকতে হবে। এরপরই প্রথম মাস্টারস্ট্রোক। যাতে সকলে গভীর ঘুমোয় তাই ঘুমের ওষুধের প্ল্যানটা বের করে। সঙ্গেই এনেছিল। ঘুমের ওষুধ কিন্তু তিনজনকে দেয়। নিজে খায় না আর সুবিমলকে ঘুমের ওষুধের বদলে ডাইউরেটিক ট্যাবলেট, ল্যাসিক্স খাওয়ায়। অ্যালজোলাম আর ল্যাসিক্স প্রায় একই সাইজের। ডার্কনেসে অত মদ খেয়ে কারো পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয় ওর এই হাতসাফাইটা।

- কিন্তু এই ট্যাবলেটের কাজ কী?

স্যান্ডিকে থামিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করেন সিএম। ইতিমধ্যে দারুন সুগন্ধ ছড়ানো চা হজির হয়েছে। স্যান্ডি ওর কাপে একটা চুমুক দেয়।

- এর কাজ হচ্ছে বেশি বেশি ইউরিনেট করানো। সাধারণত প্রেশকিপ্সন ছাড়া পাওয়া যায় না। কিন্তু অভীক এম আর হওয়ায়, জোটাতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। আমার ধারণা মার্ডারের ওর অন্য যে প্ল্যানটা ছিল তারও একটা পার্ট ছিল এই ওষুধ। সেটা কী, আমি বলতে পারব না। তাই ও এই ওষুধ সঙ্গে করে নিয়েই আসে। এরফলে যেটা দাঁড়াল, তিনজন ডিপ স্লিপে থাকবে। সুবিমলের যতই নেশা হোক ওকে বার বার বাথরুম করতে উঠতেই হবে। আমার ধারণা অন্তত বার তিনেক বাথরুম করার পর সুবিমলকে দিয়ে ভুলটা করাতে পেরেছে অভীক। না হলে ভোর রাত অবধি সুবিমল বাঁচে না।

- কিন্তু ম্যাডাম ভুলটা করাল কী ভাবে?

এবার বিস্মিত প্রশ্ন ডিএম সাহেবের।

- এটাই দ্বিতীয় মাস্টারস্ট্রোক। আই বিলিভ, জেরায় ও নিশ্চয় কনফেস করবে। যখনই সুবিমল প্রথমবার বাথরুম গ্যাছে তখনই অভীক জাস্ট বালিশটাকে খাটের অন্যপ্রান্তে করে দিয়েছে। যাতে ফিরে এসে সুবিমল উল্টোদিকে বালিশ দেখে ঘুরে শোয় আর পরেরবার বাথরুম করতে উল্টোদিকে নামে।

- মাই গড কী সাংঘাতিক আইডিয়া!

বিস্ময় গোপন করেন না সিএম। স্যান্ডি হালকা হেসে আবার শুরু করে।

- সুবিমলের কপাল ভালো তাই প্রথম বার তিনেক ও বালিশ ঠিক করে নেয়। হয়তো অবাক হয়েছিল অথবা ইনটক্সিকেটেড থাকায় মাথাই ঘামায়নি। কাঠের ঘর হওয়ায় এবং সম্ভবত অভ্যাসও ছিল না বাড়িতে চটি পড়ে থাকার তাই ওটা নিয়ে অভীককে ভাবতে হয়নি। নাহলে ওকে চটিও সরাতে হত। যাইহোক বার তিনেক ব্যর্থ হলেও অভীক আশা ছাড়েনি। ও জানত একবার ভুল করবেই সুবিমল। অবশেষে সেই ভুল হল। বারবার ইউরিনেট করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ডেফিনিটলি, তারপর ইনটক্সিকেশন। ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। এটাই ফোর্স করতে চেয়েছিল অভীক। তাই শেষবার শুতে গিয়ে যেদিকে বালিশ দেখেছে সেদিকেই মাথা করে শুয়ে পড়ে সুবিমল। আর পরেরবার বাথরুম যাওয়ার সময় স্বাভাবিক ভাবেই ওর বাম ডান সব উল্টো হয়ে যায়। এটা ঘুমের ঘোরে যে কারুর সঙ্গেই হতে পারে। দ্যান হি চুসড দ্য রঙ ডোর।

চুপ করে স্যান্ডি। ঘরে নিঃশব্দ বিমুগ্ধতা। প্রথম মুখ খোলেন সিএম-ই।

- অসাধারণ, সন্দ্যিকা। আমরা সবাই তোমার জন্য গর্বিত।

- আমার দুটো প্রশ্ন আছে ম্যাডাম।

এতক্ষণে কথা বলেন এসপি সাহেব।

- হ্যাঁ, বলুন না।

- ফার্স্ট অফ অল ঘরে আরও তিনজন ঘুমোচ্ছিল। তারাও তো যে কেউ, এই ভুল করতে পারত?

- সে চান্স ছিল খুবই কম। আপনি যদি বেড অ্যারেঞ্জমেন্টগুলো মনে করেন তাহলে দেখবেন দুজনের ক্ষেত্রে বাথরুম ছিল সামনের দিকে। আর একজনের ক্ষেত্রে পাশের দিকে। তার অন্যপাশে আর একটা খাট। যাদের ক্ষেত্রে সামনে ছিল তাদের পক্ষে ভুল দরজায় যেতে হলে ডানদিকে যেতে হত। আর পরেরজনের ক্ষেত্রে সামনে যেতে হত। ঘুমের ঘোরে ডাইনে বাঁয়ের ভুলটা যতটা কমন সামনে পিছনে ঠিক ততটা নয়। তাছাড়া অভীক জেগেই ছিল। কেউ উঠে ভুল করছে দেখলে কোনো না কোনো ছুতোয় সামলে নিতই। 

- আর স্ক্রু-ড্রাইভার কেন এনেছিল?

- আনেনি। ওর তো আইডিয়াটা রুম দেখার পরে এল। আমার ধারণা, কাল রিসর্ট খালি হয়ে আবার যখন মিস্ত্রিরা কাজ শুরু করবে, তখনই তারা একটা স্ক্রু-ড্রাইভার খুঁজে পাবে না। নিচে এরকম অনেক টুলস রাখা আছে এসপি সাহেব।

- তুই নিশ্চিত হলি কি করে যে ও স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়েই তালা ভেঙেছে?

এবার থাকতে না পেরে আমি জিগ্যেশ করি।

- প্রথমত এধরনের ছোটো তালা ভাঙতে স্ক্রু-ড্রাইভার আইডিয়াল। সেকেন্ডলি, দরজার কড়ার কাছে পরীক্ষা করার সময় যে দাগগুলো দেখেছি সেগুলো টাটকা এবং নিঃসন্দেহে স্ক্রু-ড্রাইভারের দাগ।

কিন্তু আমার প্রশ্ন শেষ হয় না।

- হঠাত্‌ করে ডাইউরেটিকের কথা তোর মাথাতে এল কেন? একটা তো কারণ থাকবে!

- সিম্পল। কারণ একটা নয় দুটো আছে। সেগুলো তুইও জানতিস। কিন্তু ভাবিসনি।

- কী বলবি তো?

- ফার্স্ট অফ অল যে পদ্ধতিতে মারা হয়েছে, আই মিন যেভাবে চান্স ফ্যাক্টরকে নিজের ফেভারে এনেছে অভীক, তাতে রাতে সুবিমলের বারবার বাথরুম যাওয়া নিশ্চিত করতেই হত। শুধু মদের উপর বিশ্বাস রাখা গ্যাম্বলিং-এর সামিল হত। দ্বিতীয়ত এদের মধ্যে দুলাল আর অভীক-ই এমন দুই ব্যাক্তি যাদের মেডিসিন সম্পর্কে নলেজ আছে। এম আর হওয়ায় অভীকের একটু বেশি।   

এতক্ষণে আমি মেনে নিই। না, আর কোথাও কোনো ফাঁক নেই। সকলেই খুশি। সিএম তো উচ্ছসিত। ডিনারের নেমতন্নই করে ফেললেন আমাদের। তারপর হঠাত আমাকে আক্রমণ।

- তা সাক্ষরবাবু বিয়ের নেমন্তন্নটা করবে তো?

- আপনি কী করে…

- আরে আমি স্যন্দিকা না হতে পারি, একটু আধটু খবর তো সিএম-কেও রাখতে হয়। তুমি তো চিফ রিপোর্টার হয়ে আমাকে ভুলেই গ্যাছো।

সকলেই হেসে ওঠেন। ওদিকে বাইরের জনতাও অধৈর্য হয়ে উঠেছে। সিএম-এর ইঙ্গিতে সবাইকে আসতে বলা হয়। শুরু হয় সেদিনকার আলিপুরদুয়ার জেলার প্রশাসনিক বৈঠক নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্স।

 

পুঃ- দুদিন পর মঙ্গলবার আমরা কলকাতা ফিরলাম। সেদিনই আলিপুরদুয়ারের এসপি ফোন করলেন স্যান্ডি-কে। তিনটি তথ্য জানালেন। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে ডাইউরেটিক প্রয়োগের উল্লেখ আছে। জানা গিয়েছে স্ক্রু-ড্রাইভারটি রিসর্টেরই। তাতে অনেক হাতের ছাপের মধ্যে অভীকের হাতের ছাপও মিলেছে। অভীক কনফেস করেছে। স্যান্ডি যা যা বলেছিল হুবহু তাই। এমনকি ও যে হত্যার পরিকল্পনা করেই এসেছিল তাও স্বীকার করেছে। রিসর্টে হঠাত্‌ সুযোগ পেয়ে গেল তাই, না হলে পরদিন রূপং ভ্যালিতে গিয়ে রাতের অন্ধকারে খাদে ফেলার পরিকল্পনা ছিল। সেখানে টেন্টে থাকতে হত। সেক্ষেত্রেও ওই একই পদ্ধতি প্রয়োগ করত, শুধু বালিশ ঘোরাতে হত না।

For any media inquiries, please contact Bahoman Magazine:

                     INDIA

+918777803163

  • White Facebook Icon
  • White Instagram Icon

© 2019Shamik Goswmi - Web Designed - Neel Majumder

  • Black Facebook Icon
  • Black Instagram Icon